ধান্দাবাজি কথাটা শুনতে অনেক পুরাতন মনে হলেও বর্তমানে দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশ মর্যাদা লাভ করেছে। তথাকথিত অনেকগুলো মহৎ মহৎ পেশা একত্র হয়ে ধান্দাবাজি রূপ ধারণ করেছে। যেমন ঠিকাদারি, সিন্ডিকেট ,চোরা চালান, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, চুরি ডাকাতি পকেটমার ছিনতাই, ঘুষ দুর্নীতি, চাকরি বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য,নারী বাণিজ্য,কমিশন বাণিজ্য, সেটেলমেন্ট, বিচার সালিশ এরকম আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্ম এতে সংযুক্ত হয়েছে । এ কারণে ধান্দাবাজি অনেক মর্যাদাপূর্ণ পেশায় পরিণত হয়েছে। ধান্দাবাজি একবার শুরু করলে যেরুপ আর্থিক সচ্ছলতা পাওয়া যায় পৃথিবীর অন্য কোন কাজে সেরূপ পাওয়া যায় না। ধান্দাবাজির মাধ্যমেই জিরো থেকে হিরো হওয়া যায়।
ধান্দাবাজরা ছোটবেলা থেকেই ধান্দাবাজির কারণে লেখাপড়া তেমন করতে পারে না, করলেও ভালো চাকরি পাওয়ার যোগ্যতা নেই, কোনরকম টিউশনি ফিউশনি করে জীবন শুরু করে। কিন্তু কোনক্রমে একবার ধান্দাবাজির লাইন পেয়ে গেলে আর থামায় কে? তরতর করে উপরে উঠতে থাকে। কারণ ধান্দাবাজি এমন একটি পেশা দেশের যেকোনো স্থানে এ কর্মে নিয়োজিত হওয়া যায়। সারা মাস ঘোরাফেরা করে জায়গা মতো একটা দাঁও মারতে পারলে বছরের আয় হয়ে যায়।
ধান্দাবাজি যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা এ কারণে এই পেশায় ওভার স্মার্ট লোকের প্রয়োজন। সকলে এই পেশায় যুক্ত হতে পারেনা । এই পেশার জন্য নির্দিষ্ট কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য লাগে। এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কিছুটা বংশগত এবং কিছুটা অভাব অভিযোগ ও সামাজিক ঘাত প্রতিঘাতে সৃষ্টি হয়। আর মৌলিকভাবে এই পেশার জন্য দুটি গুন খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি হল সুন্দরভাবে কথা বলতে পারা, সত্য মিথ্যা ন্যায় অন্যায় সবকিছু মিলিয়ে মুখের উপর ঠাস ঠাস করে এমন ভাবে কথা বলবে যা শতভাগ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে যাবে। দ্বিতীয়টি হল সুন্দর চেহারা, পোশাক পরিচ্ছদে বেশ স্মার্ট, দেখলেই যেন মনে হয় ওরে বাবা--- না জানি কত কি?
এদের আচার ব্যবহার কথাবার্তা শালীনতা বোধ সবকিছু দেখে এক বাক্যে ফেরেশতার মতো মনে হবে। যে যত বড় ধান্দাবাজ তাকে ততই বেশি বিনয়ী এবং ভদ্র মনে হবে। অপরিচিত যে কেউ তাকে সমাজের দেশের ও দশের কল্যাণকামী মনে করতে বাধ্য। সমাজের চোখে ধান্দা লাগাতে পারলেই এখান থেকে ধান্দাবাজি শুরু হয়ে যায়। একবার শুরু হলে আর সহজে বন্ধ করা যায় না, বন্ধ হতে চায় না বা দেয় না।
শহর অঞ্চল থেকে প্রতন্ত গ্রাম সর্বত্র ধান্দাবাজের ছড়াছড়ি। প্রত্যেকটি ধান্দাবাজের নির্দিষ্ট সেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়দাতা আছে। গ্রামের ছিসকে চোর, ডাকাত কিংবা পকেটমার সেই এলাকার কোন না কোন মেম্বার চেয়ারম্যানের সেল্টারে থাকে। কারণ মেম্বার চেয়ারম্যানদের বিপদে-আপদে এদের প্রয়োজন হয়। তেমনি ভাবে উপজেলা শহর জেলা শহর বিভাগীয় শহর এমনকি আমাদের খোদ রাজধানী শহরেও সকল প্রকার ধান্দাবাজরা কারো না কারো শেল্টারে আছে। ধান্দাবাজদের সর্বোত্তম সেল্টার হল রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলসমূহের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা-নেত্রীদের আন্ডারে ঐ সকল ধান্দাবাজরা আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে। এ কারণেই দেখা যায় ঐ সকল ধান্দাবাজরা রাজনৈতিক দলের পদ ও পদবী লাভ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কারণ একবার কোন রাজনৈতিক দলের কোনো না কোনো একটি পদ পেলে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার হয়ে যায়। কারণ এতদিন সে রাজনৈতিক নেতার সেল্টারে ছিল এখন পদ পাওয়ার পর সে অনেককে সেল্টার দিবে। এটা কি চাট্টিখানি কথা?
রাজনৈতিক পদপ্রাপ্ত হওয়ার পর কাজকর্ম ধান্দাবাজি থাকলেও তখন পেশার মান উন্নয়ন হয়ে রাজনীতি হয়ে যায়। এরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবসময় সামনের কাতারে থাকতে চায়। নেতৃবৃন্দের সাথে সেলফি তুলে সকলকে জানিয়ে দেয়। ধান্দাবাজির পেশা আপডেট করে রাজনীতিবিদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পেশা রাজনীতি এমন নেতাকর্মী সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। মূলত এ কারণেই এ সকল ধান্দাবাজরা নিজেদের ধান্দাবাজির রাজত্ব অটুট রাখার জন্য দলকে ক্ষমতায় আনতে যেকোনো নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করতেও প্রস্তুত। দেশ ও জাতির ভালো-মন্দ কি হবে না হবে তাদের জন্য এটা কোন বিষয় না। ধান্দাবাজি থাকতে হবে, ধান্দাবাজি করার সুযোগ দিতে হবে।কারণ ধান্দাবাজি না থাকলে নিজেদের অস্তিত্ব থাকবে না।
এসব কারণে ওরা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে পছন্দ করেনা। নিয়মতান্ত্রিক দলের দুর্নীতিমুক্ত চাঁদাবাজ মুক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে ধান্দাবাজির পেশা বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এরা জান প্রান দিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বিরোধিতা করতে থাকে। অনেক সময় ভালো পরিবারেও অকর্মণ্য কিছু ধান্দাবাজ সৃষ্টি হয়। সময় ও সুযোগ বুঝে অতি লাভের আশায় এরা অনেক সময় নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে যুক্ত হয়। যেহেতু তারা ত্রুটিপূর্ণ নিয়তে ধান্দাবাজির চিন্তায় অগ্রসর হয়, নিয়ম তান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি মুক্ত সৎ নেতৃত্বের পরশেও তাদের কোন পরিবর্তন আসে না। বরং ঐ সকল সৎ ও দুর্নীতিমুক্ত নেতাকর্মীদেরকে ধান্দাবাজরা বোকাসোকা মনে করে। যাঁরা এ সকল ধান্দাবাজকে জাহান্নামের কিনার থেকে জান্নাতের রাস্তা দেখিয়ে দেয়, জান্নাতের রাস্তায় নিয়ে আসতে চায় তাদেরকে অগ্রাহ্য করা হয়। জান্নাতের পথে এরা টিকে থাকতে পারে না। শরীরে বিষ ফোঁড়া হলে যত কষ্টই হোক কেটে ফেলতে হয়। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে খান খান হয়ে যায়। মেনে নিতে খুব কষ্ট হয়, এক্ষেত্রে দোয়া করা ছাড়া করার কিছুই থাকেনা।
ধান্দাবাজের সেরা ধান্দাবাজি হল ধর্মের ছাতার নিচে আশ্রয় নেওয়া। তাইতো দেখা যায় কেউ কেউ টুপি মাথায় দিয়ে ধান্দাবাজি করাকে অনেক নিরাপদ মনে করে, এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। যদি ধান্দাবাজি করতে চাও তাহলে টুপি মাথায় দাও কেন? আধিপত্যবাদী ধান্দাবাজির সিন্ডিকেট টুপিওয়ালা ধান্দাবাজকে সবার সামনে উন্মুক্ত করে টুপিতে কালি লাগিয়ে দেওয়ার জন্য কখন যে ফিউজ করে দিবে এই চিন্তা ও ভয় তাদের মনে কেন আসে না? যেখানে পুরান পাগলের ভাত নেই , এখানে আবার নতুন পাগলের আনাগোনা করে লাভ কি? আফসোস এমন ঘটনা অহরহ ঘটার পরও কেউ সাবধান হয় না।
পৃথিবীতে জন্মগ্রহণকারী প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব মহান রাজ্জাকের। সকল ধর্ম মত অনুযায়ী কর্মকে মহান বলা হয়েছে। ধান্দাবাজি পেশায় অনেক মেধা ও শ্রমের প্রয়োজন, সেই শ্রম ও মেধা সৎ কাজে ব্যয় করলে কতই না ভালো হয়। সৎ পথে সৎকর্মে নিরাপদ জীবন যাপন করা যায়, সমাজের সর্বস্তরের মানুষের নেক দোয়া ও ভালোবাসা পাওয়া যায়। অন্যদিকে ধান্দাবাজরা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ঘৃণিত, লাঞ্ছিত, নিজের জীবনের নিরাপত্তা পায় না। অতি লোভ মানুষকে অমানুষ বানিয়ে ফেলে অমানুষেরাই ধান্দাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। ধান্দাবাজির সিন্ডিকেট ভেঙ্গে সকলকে আলোর পথে আসার চেষ্টা করতে হবে। নিয়ম তান্ত্রিক পথে জীবন যাপন করার অভ্যস্ত হতে হবে। দিন বদলে যাচ্ছে, ধান্দাবাজির সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে। গ্রামেগঞ্জে শহরে বন্দরে সকল স্থানে ধান্দাবাজির বিরুদ্ধে কণ্ঠস্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।
আমরা আলোর পথের যাত্রী, আলোর পথ দেখাই। আর কত! এবার ভালো হতে চাই, যত কষ্টই হোক ভালো হতেই হবে, ধান্দাবাজির রাজনীতি এদেশে আর চলবে না। যারা ধান্দাবাজি করে তাদের প্রতিশ্রুতি, তাদের ওয়াদায় জনগণ আশ্বস্ত হবে না, বিশ্বাস করবে না। অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে অনেক ধান্দাবাজ এসেছে গিয়েছে, এবার সকল প্রকার ধান্দাবাজকে লাল কার্ড দেখানোর জন্য জনগণ জোট বেঁধেছে। এখনো সময় আছে আসুন সকলে মিলে আলোর পথে যাত্রা শুরু করি।
শাহ আজিজুর রহমান তরুণ
লেখক ও গবেষক